কিডনি ও মূত্রনালী
কিডনি ও মূত্রনালীর সমস্যা সবসময় শুরুতেই বোঝা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে কিডনির কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে গেলেও দীর্ঘ সময় কোনো স্পষ্ট উপসর্গ দেখা দিতে পারে না। আবার কিডনিতে পাথর বা মূত্রনালীর সংক্রমণের মতো কিছু সমস্যায় হঠাৎ তীব্র ব্যথা, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, জ্বর বা প্রস্রাবে রক্ত দেখা দিতে পারে।
তাই কিডনি বা প্রস্রাবের কোনো অস্বাভাবিকতা বারবার হলে শুধু উপসর্গ কমানোর চেষ্টা না করে সমস্যার কারণ খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ।
উপসর্গ
- • কোমরের একপাশে বা পিঠের নিচের দিকে ব্যথা (mild)
- • পাশের অংশে তীব্র বা চাপধরনের ব্যথা (mild)
- • তলপেটে ব্যথা বা অস্বস্তি (mild)
- • কুঁচকিতে ছড়িয়ে পড়া ব্যথা (mild)
- • প্রস্রাব করার সময় জ্বালাপোড়া (mild)
- • বারবার প্রস্রাবের বেগ পাওয়া (mild)
- • অল্প প্রস্রাব হলেও বারবার প্রস্রাবের অনুভূতি (mild)
- • প্রস্রাবের পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় কমে যাওয়া (mild)
- • প্রস্রাব করতে কষ্ট হওয়া (mild)
- • প্রস্রাব শুরু হতে দেরি হওয়া (mild)
- • প্রস্রাবের ধারা দুর্বল হয়ে যাওয়া (mild)
- • প্রস্রাব আটকে যাওয়া (mild)
- • প্রস্রাবে রক্ত দেখা (mild)
- • প্রস্রাব ঘোলা হওয়া (mild)
- • প্রস্রাবের গন্ধ অস্বাভাবিক বা তীব্র হওয়া (mild)
- • প্রস্রাবে অতিরিক্ত ফেনা দেখা (mild)
- • রাতে বারবার প্রস্রাব হওয়া (mild)
- • প্রস্রাবের সঙ্গে ব্যথা বা চাপ অনুভূত হওয়া (mild)
- • জ্বর ও কাঁপুনি (mild)
- • বমি বমি ভাব (mild)
- • বমি (mild)
- • শরীর দুর্বল বা অতিরিক্ত ক্লান্ত লাগা (mild)
- • পা ও গোড়ালি ফুলে যাওয়া (mild)
- • চোখের চারপাশে ফোলা (mild)
- • ত্বকে চুলকানি (mild)
- • পেশিতে টান বা ক্র্যাম্প (mild)
- • শ্বাসকষ্ট (mild)
- • ক্ষুধা কমে যাওয়া (mild)
- • অকারণে ওজন কমে যাওয়া (mild)
- • রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া (mild)
- বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের ক্ষেত্রে শুরুতে কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। রোগ অনেকটা এগিয়ে গেলে ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, চুলকানি, পা ফুলে যাওয়া, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। (mild)
কারণ
কিডনি ও মূত্রনালীর সমস্যা একাধিক কারণে হতে পারে। সব রোগের কারণ এক নয়।
১. ডায়াবেটিস
দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা বেশি থাকলে কিডনির ক্ষুদ্র রক্তনালী ও ফিল্টারিং ব্যবস্থার ক্ষতি হতে পারে। সময়ের সঙ্গে এটি Chronic Kidney Disease-এর কারণ হতে পারে।
২. উচ্চ রক্তচাপ
অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ কিডনির রক্তনালী ও ফিল্টারিং ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। আবার কিডনি রোগের কারণে রক্তচাপও বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ দুই সমস্যার মধ্যে একটি পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে।
৩. পর্যাপ্ত পানি না পান করা
বিশেষ করে কিডনি স্টোন হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে কম তরল গ্রহণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রত্যেক মানুষের প্রয়োজন এক নয়, এবং কিডনি বা হৃদযন্ত্রের নির্দিষ্ট রোগ থাকলে অতিরিক্ত পানি পান করাও সবসময় নিরাপদ নয়।
৪. কিডনিতে পাথর
প্রস্রাবে ক্যালসিয়াম, অক্সালেট, ফসফরাস বা অন্যান্য কিছু পদার্থের মাত্রা বেশি হলে স্ফটিক জমে কিডনিতে পাথর তৈরি হতে পারে। পাথরের আকার ও অবস্থানের ওপর উপসর্গ নির্ভর করে।
৫. মূত্রনালীর সংক্রমণ
মূত্রনালীর সংক্রমণ সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। মূত্রথলিতে শুরু হওয়া সংক্রমণ চিকিৎসা না পেলে কখনও কখনও কিডনিতে ছড়িয়ে যেতে পারে।
৬. কিডনি ইনফেকশন
কিডনি ইনফেকশন বা Pyelonephritis সাধারণত মূত্রনালীর সংক্রমণ থেকে শুরু হয়ে কিডনিতে পৌঁছাতে পারে। জ্বর, কাঁপুনি, প্রস্রাবে ব্যথা এবং পিঠ বা পাশের অংশে ব্যথা এর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে।
৭. বংশগত ও জেনেটিক কারণ
কিছু কিডনি রোগ পরিবারে চলতে পারে। যেমন Polycystic Kidney Disease এবং কিছু বিরল জেনেটিক রোগ।
৮. কিছু ওষুধ ও বিষাক্ত পদার্থ
কিছু ওষুধ, রাসায়নিক পদার্থ বা বিষাক্ত উপাদান কিডনির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন কোনো ওষুধ নিজের মতো করে ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
৯. হৃদরোগ ও অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী রোগ
হৃদযন্ত্র, লিভার বা শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কিছু গুরুতর রোগ কিডনির কার্যক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
১০. পানিশূন্যতা, গুরুতর সংক্রমণ বা হঠাৎ অসুস্থতা
শরীরে অতিরিক্ত পানি কমে যাওয়া, গুরুতর সংক্রমণ, বড় অস্ত্রোপচার, আঘাত বা কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় Acute Kidney Injury হতে পারে।
জরুরি সতর্ক সংকেত
কিডনি বা মূত্রনালীর কিছু লক্ষণকে সাধারণ সমস্যা ভেবে অপেক্ষা করা ঠিক নয়।
নিচের যেকোনো পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন:
তীব্র বা হঠাৎ ব্যথা
কোমর, পিঠ, পাশ বা তলপেটে হঠাৎ তীব্র ব্যথা হলে বিশেষ করে কিডনি স্টোন বা অন্য কোনো জরুরি সমস্যার সম্ভাবনা বিবেচনা করতে হয়।
প্রস্রাবে রক্ত
চোখে দেখা রক্ত বা প্রস্রাবের রং গোলাপি, লাল কিংবা বাদামি হয়ে গেলে কারণ খুঁজে দেখা জরুরি।
প্রস্রাব একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়া
অনেকক্ষণ প্রস্রাব না হওয়া বা প্রস্রাব করতে না পারা জরুরি চিকিৎসার বিষয় হতে পারে।
জ্বরের সঙ্গে কোমর বা পাশের ব্যথা
জ্বর, কাঁপুনি, প্রস্রাবে ব্যথা এবং কোমর বা পাশের ব্যথা একসঙ্গে থাকলে কিডনি ইনফেকশনের সম্ভাবনা থাকতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
বারবার বমি ও পানিশূন্যতা
তীব্র ব্যথা বা সংক্রমণের সঙ্গে বারবার বমি হলে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হতে পারে এবং পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে পারে।
শরীর ফুলে যাওয়া ও শ্বাসকষ্ট
পা, গোড়ালি বা শরীরের অন্যান্য অংশ ফুলে যাওয়ার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
বিভ্রান্তি বা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব
গুরুতর সংক্রমণের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি, অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব, দ্রুত শ্বাস নেওয়া বা খুব দ্রুত হৃদস্পন্দন দেখা দিতে পারে। এগুলো Sepsis-এর মতো গুরুতর অবস্থার লক্ষণ হতে পারে।
এই ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।